দ্বাদশ শতকে ভারত আক্রমণকারী মহম্মদ ঘোরির সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবকের (পরবর্তীকালে দিল্লির সুলতান) হাতেই না কি প্রথম আক্রান্ত হয়েছিল কাশীর আদি বিশ্বনাথ মন্দির। কয়েক বছর পর কাশীর বাসিন্দারা সংস্কার করেন মন্দিরটি। জ্ঞানবাপী মসজিদ লাগোয়া জমিতে এখন যে বিশ্বনাথ মন্দির রয়েছে তা অষ্টাদশ শতকের। মধ্যপ্রদেশের ইনদওরের হোলকার রাজবংশের রানি অহল্যাবাই ওই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে জ্ঞানবাপীর জমিতে মন্দির গড়ার দাবি উঠেছিল। ১৯৩৬ সালে বারাণসীর আদালতে সেই আবেদন জানানো হলেও জ্ঞানবাপীতে নামাজের অধিকার বজায় থাকে। ১৯৪২ সালেএ ইলাহাবাদ হাই কোর্টও সেই রায় বহাল রেখেছিল। ১৯৯১ সালে সোমনাথ ব্যাস এবং রামরঙ্গ শর্মা নামে দুইজন আবেদনকারী জ্ঞানবাপী মসজিদে হিন্দুদের অধিকারের দাবিতে আবারও বারাণসীর আদালতের দ্বারস্থ হন। দাবি জানান, ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (এএসআই) তত্ত্বাবধানে সমীক্ষা ও ‘সত্য’ উদ্ঘাটনের।
জ্ঞানবাপী মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দেওয়াল এবং তহ্খানায় হিন্দু মন্দিরের নানা চিহ্ন রয়েছে বলে দাবি করেছিল আবেদনকারী পক্ষ। পাশাপাশি, ওজুখানার জলাধারের নীচে প্রাচীন শিবলিঙ্গের উপস্থিতিরও দাবি জানানো হয়েছিল। আদালতের নির্দেশে ১৯৯৬ এর জুলাই মাসে মসজিদ চত্বরে সমীক্ষার কাজ চালানো হয়েছিল। সেই সমীক্ষার রিপোর্টও জমা পড়েছিল আদালতে। কিন্তু সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, তাতে মন্দিরের উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে।
বারাণসী আদালত ১৯৯৭ সালে ঘোষণা করে, ১৯৯১-এর ধর্মীয় উপাসনাস্থল আইন অনুযায়ী জ্ঞানবাপী মসজিদ আবেদনকারী পক্ষকে (হিন্দু) দেওয়া সম্ভব নয়। সেখানে বর্তমান বন্দোবস্তই বহাল থাকবে।
নরসিংহ রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় পাশ হওয়া ওই আইনের চার নম্বর ধারা বলছে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগে থেকে দেশে যে সব ধর্মীয় কাঠামো রয়েছে, তার অবস্থান কোনও ভাবেই পাল্টানো যাবে না।
২০২১-এর অগস্টে পাঁচ হিন্দু মহিলা জ্ঞানবাপীর ‘মা শৃঙ্গার গৌরী’ (ওজুখানা ও তহখানা নামে পরিচিত) এবং মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে দেবদেবীর মূর্তির অস্তিত্বের দাবি করে তা পূজার্চনার অনুমতি চেয়েছিলেন বারাণসী আদালতে।
বারাণসী আদালতের বিচারক রবিকুমার দিবাকরের নির্দেশে তিন অ্যাডভোকেট কমিশনার, এএসআই-এর বিশেষজ্ঞ এবং যুযুধান দু’পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সমীক্ষা এবং ভিডিওগ্রাফির চূড়ান্ত রিপোর্ট ১৯ মে আদালতে জমা পড়ার কথা।
ওজুখানার ওই জলাধারের একটি ছবি ইতিমধ্যেই সবার সামনে এসেছে (ডিবিসি নিউজ অনলাইন তার সত্যতা যাচাই করেনি)। তাতে জলাধারের মাঝে গম্বুজাকৃতি পাথরের অংশ দেখা যাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি সেটি প্রাচীন শিবলিঙ্গের অংশ।
ঘটনাচক্রে, ওই জলাধারের ঠিক ৮৩ ফুট দূরে, পাঁচিলের ওপারে বিশ্বনাথ মন্দির চত্বরে রয়েছে নন্দীমূর্তি। যার মুখ ওজুখানার ওই গম্বুজাকৃতি পাথরের দিকেই। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, নন্দীমূর্তির মুখ সবসময় শিবলিঙ্গের দিকেই থাকে।
মুসলিমদের দাবি, ওজুখানার পাথরের কাঠামো আদতে একটি ফোয়ারার নির্গমন মুখ। মুঘল যুগে তাজমহল-সহ অনেক স্থাপত্যেই ফোয়ারার উপস্থিতি রয়েছে। পুরনো বহু মসজিদেও নমাজের আগের ওজু করার স্থানে ফোয়ারা রয়েছে।
ওজুখানার ওই পাথরের কাঠামোর উপরে রয়েছে ফোয়ারার নির্গমন-মুখের মতোই কাটা-চিহ্ন। এ ক্ষেত্রে পাল্টা যুক্তি, শিবলিঙ্গের চরিত্র বদলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরবর্তীকালে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে মুখটি কেটে দেওয়া হয়েছে।