পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় আবারও বাড়িঘর ভাঙার অভিযান জোরদার করেছে দখলদার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। আল-আকসা মসজিদের খুব কাছের এই ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকাকে ঘিরে নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এটি শুধু কয়েকটি বাড়ি ভাঙার ঘটনা নয়; বরং ধীরে ধীরে পুরো এলাকাকে ফিলিস্তিনিশূন্য করার পরিকল্পনার অংশ। অনেকেই একে নতুন নাকবার সূচনা বলেও বর্ণনা করছেন।
ফিলিস্তিনিদের ভাষায় নাকবা বলতে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় লাখো ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে বোঝানো হয়। সিলওয়ানের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে।
প্রসঙ্গত, নাকবা আরবি শব্দ যার অর্থ বিপর্যয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ৭ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি নাগরিকের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বাস্তুচ্যুত এবং গণহত্যার ঘটনা ঘটে। জাতিগত এই নির্মূল অভিযান ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের উদাহরণ হয়ে আছে। প্রতি বছর ১৫ মে ফিলিস্তিনিরা এই শোকাবহ দিনটিকে ‘নাকবা দিবস’ হিসেবে পালন করে। ইরান যুদ্ধের আবহে নতুন করে ফিলিস্তিনের বিপুল পরিসরে উচ্ছেদে নামছে ইসরায়েলি বাহিনী।
আল-আকসা মসজিদের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত সিলওয়ান বহু বছর ধরেই দখল, উচ্ছেদ এবং বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উত্তেজনার কেন্দ্র। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, যেসব বাড়ি ভাঙা হচ্ছে তার অনেকগুলোর ‘বৈধ নির্মাণ অনুমতি’ নেই। কিন্তু স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্মাণ অনুমতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব করে রাখা হয়েছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়েই অনুমতি ছাড়া ঘর নির্মাণ করেন, পরে সেগুলো অবৈধ দেখিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সিলওয়ানের একাধিক এলাকায় বুলডোজার অভিযান চালানো হয়েছে। ঘর হারানো পরিবারগুলোর অনেকেই বলছেন, কয়েক দশক ধরে বসবাস করা বাড়ি মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শিশুদের বই, কাপড়, আসবাব, সবকিছু ধুলার নিচে চাপা পড়ে আছে। অনেক পরিবার এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সিলওয়ানকে ঘিরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সংগঠনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে সিটি অব ডেভিড নামে প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটন প্রকল্পের আড়ালে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি বসতি সংকুচিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, অধিকৃত ভূখণ্ডে জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তবে ইসরায়েল সরকার বরাবরই বলছে, তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।
গাজা যুদ্ধের পর থেকেই পূর্ব জেরুজালেমে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, যুদ্ধের আড়ালে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে দখল এবং উচ্ছেদের গতি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে আল-আকসাকে ঘিরে যেকোনো পদক্ষেপ মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সিলওয়ানের এক বাসিন্দা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা প্রতিদিন ভয় নিয়ে ঘুমাতে যাই। সকালে উঠে দেখি বুলডোজার চলে এসেছে কি না। আমাদের মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে আমাদের মুছে ফেলা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি নেতারা বলছেন, এটি কেবল আবাসন সংকট নয়; বরং জেরুজালেমের জনসংখ্যার চরিত্র বদলে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। আর সেই কারণেই সিলওয়ানের ঘটনাকে তারা একটি বৃহত্তর সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন।
সূত্র: সিএনএন ও মিডলইস্ট আই








