রোজি রাহমান
রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধে বিরতির নামগন্ধ নেই। যুদ্ধ কখন থামবে? বিশ্ব জুড়েই প্রশ্ন। যে কারণগুলোর জন্য যুদ্ধ শুরু হয়, তার ফয়সালা হয়ে গেলেই তো সংঘর্ষ থেমে যেতে পারে! তত্ত্বগতভাবে এমনটা বলা গেলেও বিষয়টি যে আদৌ ততটা সহজ নয়, তার উদাহরণ আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ার মাটিতে সংঘর্ষ। তবে কি রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধও তেমন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে? এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য-পাল্টা-মন্তব্য করছেন সমরবিদরা।
পুতিনের দাবি, প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আমলে ইউক্রেনের মাটিতে ‘গণহত্যা’ রুখতেই এ হামলা। জেলেনস্কি সরকারের এ ‘অপরাধে’ আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো
বাহিনীর মদত রয়েছে বলেও দাবি পুতিনের। ইউক্রেন আক্রমণের পেছনে আরো কারণ রয়েছে বলে দাবি রাশিয়ার। যুদ্ধের আগে ইউক্রেনের ডনেৎস্ক এবং লুহানস্ককে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন পুতিন। জেলেনস্কির কাছেও একই দাবি তার। এ ছাড়া, ২০১৪ সালের যুদ্ধে বেদখল হওয়া ক্রিমিয়াকেও রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হোক বলেও দাবি করছেন পুতিন। ইউক্রেন যাতে ন্যাটোয় যোগদান না করে, সে দাবিও রয়েছে। সূত্র রয়টার্স, পিটিআই, এএফপি এবং টুইটার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুতিনের প্রধান অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলো রাশিয়াকে ভৌগোলিকভাবে ঘিরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। প্রায় এক মাসের সংঘর্ষে দুপক্ষের কম ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অসমর্থিত সূত্রে মার্কিন গণমাধ্যমের দাবি, ইতোমধ্যেই রাশিয়ার ৭,০০০ সেনা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেলেনস্কির সেনাবাহিনীর ২,৮৭০ জন নিহত। সেই সঙ্গে ইউক্রেনের ৩০ লাখ বাসিন্দা অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর থেকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ ফায়দা করতে পারেনি রাশিয়া। খারসেন, খারকিভ, মারিয়ুপুল, সামি, চেরনিহিভসহ বহু শহর ঘিরে রেখেছে পুতিন বাহিনী। তবে খারসেনের দখল ছাড়া তাদের হাত ফাঁকা। যুদ্ধের জেরে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়েছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংকগুলো বলছে, যেভাবে নিষেধাজ্ঞার বোঝা বাড়ছে, তাতে শিগগিরই ১৫ হাজার কোটি ডলার বিদেশি মুদ্রা ঋণখেলাপি হতে পারে রাশিয়া।
যুদ্ধে ন্যাটোর ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে জেলেনস্কির। এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে অস্ত্র সাহায্য করলেও সরাসরি ময়দানে নামেনি ন্যাটো। অন্য দিকে, ইউক্রেনের আকাশসীমায় বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধও করেনি তারা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। যুদ্ধের গোড়ার দিকে উৎসাহী হলেও ইউক্রেন যে আর ন্যাটোগোষ্ঠীর সদস্য হতে চায় না, তা-ও জানিয়েছেন তিনি। তবে যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে কার্যত সুর নরম হয়েছে দুপক্ষেরই। ইউক্রেনের আশা, আগামী মে মাসের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হতে পারে। ইতোমধ্যেই রাশিয়াপন্থি ডনেৎস্ক এবং লুহানস্কের বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। অন্যদিকে রাশিয়াও বুঝতে পারছে যে কিয়েভ দখল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনা যাচাই করছেন সমরবিদরা। এমন হতে পারে যে এককালে সিরিয়া বা চেচনিয়ায় যুদ্ধের নীতিতে ইউক্রেনের মাটিতেও বোমা বর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিল রাশিয়া। যার জেরে কিয়েভের দখল নিজেদের হাতে নিয়ে ইউক্রেনে তাদের পছন্দ মতো সরকার গড়লেন পুতিন। আরো একটি সম্ভাবনা হচ্ছে, ইউক্রেনে সামরিক অভিযান পুরোপুরি থামিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু করল রাশিয়া। অন্যদিকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হয়েই ডনেৎস্ক এবং লুহানস্কের পাশাপাশি খারসেনকেও স্বাধীন বলে স্কীকৃতি দিল ইউক্রেন। আবার যুদ্ধের গতি বাড়াতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারে রাশিয়া। পশ্চিমী দেশগুলোর অস্ত্র ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইউক্রেনের পড়শি দেশ পোল্যান্ডেও আঘাত হানতে পারে পুতিনবাহিনী। এর জেরে ন্যাটোকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে আনতে পারে রাশিয়া, যাতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের বদলে পশ্চিমী দেশগুলোর সরাসরি সংঘাত শুরু হতে পারে।